গল্প ও কবিতা

চিঠিঃ বাবা – লেখকঃ রাহুল রায়

চিঠি,
বাবা ।
আচ্ছা বাবা পরপারে মানুষ কেমন থাকে গো ?
বড্ড জানতে ইচ্ছে করে বাবা ।
ওপারে কি খুব সুখে আছো বাবা ?
বাবা , তুমি তোমার নিজের সুখের কথা চিন্তা করে ওপাড়ে চলে গেছো ।
একটি বারের জন্যও কি আমাদের কথা মনে হয়নি বাবা। যে আমাদেরকে একা করে দিয়ে গেলে আমরা কি করে থাকবো?
আচ্ছা , আমরা না হয় জীবন ব্যস্ততার অজুহাতে শিষ্টতার মুখোশ খুলে তোমাকে জড়িয়ে ধরে বলতে পারিনি তোমাকে পাগলের মতো ভালবাসি বাবা ।
কিন্তু, তুমি তো জানতে বাবা তোমার জন্য আমাদের মনে ভালবাসার কোন কমতি ছিলো না বাবা ।
বাবা বুকটা চিড়ে যদি কখনো দেখাতে পারতাম তোমার জন্য বুকে কতটা ভালোবাসা জমা আছে, তবে হয়তো তুমি একা ফেলে যেতে পারতে না বাবা।
সত্যি বলতে কি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা কখনো বাবা, মা , কে
ভালবাসার কথা বলতে চাইলেও বলতে পারে না । অথবা, বলা হয়ে উঠে না ।
বাবা, মায়ের প্রতি আমাদের হৃদয়ের গহিনে লুকিয়ে থাকা গভীর ভালবাসা দৈনন্দিন ব্যস্ততার কাছে’ই
থেকে যায় অজানা। আর মুখ ফুটে বলা হয়ে উঠে না। আমাদের সেই গভীর ভালবাসার কথা।
আর এই ভালবাসার কথা জীবনের শেষ দিনেও বলবো বলবো করে না বলাই থেকে যায় ।
আমি যখন ক্লাস নাইনে পড়ি একদিন তোমার জুতা গুলো পরে বাজারে গিয়েছিলাম ।
কিছু রাস্তা যেতেই জুতো গুলো বেদ করে আমার পায়ে ইটের কনা ডুকছিলো । পা দিয়ে
রক্ত চলে আসছে । তখন মনে হয়েছিলো যে জুতা গুলো আমার পরার সামর্থ্য নেই সেগুলো তুমি পড়ো কি করে বাবা ?
তখন বাজার থেকে একজোড়া জুতা কিনে তোমাকে দিতে চেয়েছিলাম । তখন আমার কোন সামর্থ্য ছিলো না বাবা ।
তুমি নিজে একজোড় জুতা কিনো না । এই কষ্ট করেও
আমাদের শত আবদার পূর্ণ করতে বাবা ।
কি সুখ পেতে বাবা নিরবে এতো কষ্ট লুকিয়ে রেখে ?
তোমাকে ছাড়া দিনগুলো যেন কাঁটতেই চায় না । ভীষণ একা লাগে ।
তুমি থাকতে ভাবতাম তুমি না থাকলে আমি কি করে থাকবো ?
তুমি নেই আজ বেশ কিছুদিন হয়ে গেলো , তোমাকে ছাড়া যে বাঁচতে পারবো তা ছিলো আমার কল্পনাতীত ।
তবে বাস্তবতা যে বড়ই কঠিন । কেটে যাচ্ছে দিনের পর দিন তোমাকে ছাড়াই ।
তবে আগের মতো আর দিনগুলো কাঁটেনা ।
বাবা , তোমার জুতা গুলো দেখার পর থেকেই প্রায় লুকিয়ে লুকিয়ে কান্না করতাম । কবে বাড়ি থেকে চাকুরী করতে যাবো । কবে তোমার কষ্ট দূর করতে পারবো ।
বাবা তোমাদের কষ্টগুলো
আমার সহ্য করতে বড্ড কষ্ট হতো বাবা । সেদিনের পর থেকেই ভেবেছিলাম আর লেখাপড়া করবো না ।
পৃথিবীতে এমন অনেক মানুষ আছে যারা লেখাপড়া না করেও
বাবা , মায়ের আর্শীবাদে অনেক বড় হয়েছে । বাবা আমার কাছে লেখাপড়া কখনো মূর্খ্য বিষয় ছিলো না ।
আমার কাছে মূর্খ্য বিষয় ছিলো আমার পরিবার । আর তোমাদের মুখে হাঁসি ফোটানো। তোমাদের স্বপ্ন ছিলো আমাকে লেখাপড়া করানোর তোমাদের স্বপ্ন পূর্ণ করার জন্য আর চাকুরী-তে যেতে পারিনি ।
তবে সেই কলেজ লাইফ পর্যন্ত যতটুকু চোখের জল ফেলেছি একটা মানুষের চোখে
এতো পরিমান চোখের জল হয়তো নেই বাবা । এইচ . এস . পাশ করার পরেই তো চাকুরী-তে চলে আসলাম তোমাকে আর কষ্ট করতে দিবো না বলে ।
বাবা তুমি সেই ছোট্ট বেলায় আমার মাথায় হাত রেখে বলেছিলে বাবারে আমার জীবনে কোন কিছু চাওয়া পাওয়ার নেই । দুটো ভাই মানুষের মতো মানুষ হ ।
এটাই আমার জীবনের একমাত্র চাওয়া পাওয়া ।
বাবা , আমার কাছে প্রতিটা দিনই মনে হতো তোমাদের জন্য কিছু করতে পারলাম না ।
বাবা , চাকুরী-তে এসেও তোমাদের স্বপ্ন পূর্ণ করার জন্য আবার লেখাপড়াটা শুরু করেছি ।
তুমি না দেখেই চলে গেলে কেনো বাবা ? তোমাকে তো আমরা কখনো কোন কিছুতে অভাব বোধ করতে দেইনি বাবা ।
নিজে একবেলা না খেয়েও যখন মোবাইলের অপর পাশ থেকে
বলতে বাবা ভাল আছি । তোমাদের এই ভাল থাকাটাই যেন ছিলো আমার বেঁচে থাকার একটা অনুপ্রেরণা বাবা ।
তোমাদের এই হাসি মুখটাই আমাদের ভাল থাকার সবচেয়ে বড় কারণ ছিলো । বাবা জানো ছোট্ট বেলার কথাগুলো আজ ভীষণ মনে পড়ছে ।
বাবা মা বলেছিলো বড় ভাই জন্ম হওয়ার পরে নাকি খুশিতে তুমি চাকুরী ছেড়ে আসছিলে দু’মাসের
জন্য । তুমিও নাকি মায়ের দায়িত্বও কিছুটা পালন করেছিলে । বাবা , মনে আছে তোমার তোমার হাত ধরেই হাটতে শিখেছিলাম ।
পৃথিবীর পথ তুমিই চিনতে শিখিয়েছিলে বাবা ।
ছোট বেলায় হাতেখড়ি আর নৈতিকতার শিক্ষাটাও তোমার কাছ থেকেই পেয়েছিলাম ।
বাবা আমাকে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি করানোর জন্য কাধে করে নিয়ে গিয়েছিলে আসার সময়
আমার হাতে বইগুলো দিয়ে বলেছিলে বাবু , একদিন অনেক বড় হবি । মানুষের মতো মানুষ হবি । তোমার চাওয়া পাওয়া ছিলো আমরা মানুষের মতো মানুষ হওয়া। আমরা মানুষের মতো মানুষ হবার আগেই কেনো চলে গেলে বাবা?
বাবা মনে পড়ছে , মা যখন আমাদের মারতে আসতো তুমি আমাকে কুলে নিয়ে মা-কে কি বকাগুলোই না দিতে ।
আমার কিছু হলেই তোমার কাছে এসে বলতাম তুমি আমাকে
কোলে নিয়ে শান্তনা দিতে । বাবা , আজ যখন রাস্তায় কোন বাবাকে দেখি বাচ্চা কোলে নিয়ে হাটছে । বা তাদেরকে হাতে হাত রেখে স্কুলে নিয়ে যাচ্ছে ।
তখন মনের অজান্তেই চোখগুলো যেন ঝাপসা হয়ে উঠে । দূর থেকে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখি।
দিন দিন বড় হতে লাগলাম। অনেক দুষ্টুমি করতাম বলে প্রায় তুমি শাষন করতে বাবা । বাবা জানো তুমি যখন শাষন করতে আমার একটুও খারাপ লাগতো না । বা কখনো মনে হতো যে আমার বাবা, মা , খারাপ । এটা আমি বুঝতাম বাবা যে যত যাই করো না কেনো আমাদের ভালর জন্যই করছো ।
বাবা , একদিন অনেক রাত করে বাসায় ফিরেছিলাম বলে তুমি খুব বকা দিয়েছিলো ।
আমি একদিন না খেয়ে ছিলাম । পরে শুনতে পেয়েছিলাম তুমিও একদিন না খেয়ে ছিলে বাবা । বাবা আমি তো না খেয়ে থাকতে পারিনি ।
আমি তোমার পকেট থেকে টাকা চুরি করে বাজারে খেয়েছিলাম বাবা ।
তুমি কি করে পারলে বাবা একদিন না খেয়ে থাকতে ? কই আমি তো পারলাম না বাবা ।
একই শহরে থাকার পরেও যখন তুমি প্রতিদিন ৬-৭ বার কল দিয়ে জানতে চাইতে,
কোথায় আছো ?
খেয়েছো কি না ?
তখন বিরক্ত লাগতো যে আমরা তো খুব কাছেই আছি ।
তবুও কেনো এতোবার কল দিচ্ছে ?
আমি প্রায় দুপুরে খেতে চাইতাম না বলে তুমি মেসে গিয়ে জানতে চাইতে আমি খেয়েছি কি না ?
আমার একটু কিছু হলেই তুমি পাগলের মতো ডাক্তারের কাছে ছুটোছুটি করতে । সব দায়িত্ব আর মাথা ব্যাথা যেন তোমারই ছিলো যদিও অসুখটা আমার ছিলো ।
বাবা , কাল রাত ৩টায় রাজশাহী থেকে ফিরে দরজার সামনে এসে অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে ডাকছিলাম বাবা ও বাবা দরজাটা খোল ।
যখন তুমি দরজাটা খুলছো না পকেটে হাত দিয়ে
দেখলাম আমার পকেটে রোমের চাবি । দরজাটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম তালা দেওয়া । প্রায় সময় অনেক রাত করে বাসায় ফিরি, আজ আর কেউ শাষন করে না বাবা ।
আমার জন্য কেউ রাতে বসে থাকে না বাবা ।
বাবা প্রতিদিন তুমি ৬-৭ বার কল দিতে । প্রতিদিন সকালে উঠি বসে থাকি তুমি কল দিয়ে জানতে চাইবে আমি নাস্তা করেছি কি না । যখন দুপুর ঘনিয়ে আসে তুমি কল দাওনা ।
তখন মনে হয় তুমি তো নেই । ওপাড়ে চলে গেছো । সেই ছোট্ট বেলার শাষন আর কেয়ারিং গুলো পেতে আজকাল বড্ড ইচ্ছে করে বাবা ।
বাবা প্রায় গভীর রাতে মনে হয় আমাকে কে যে ডাকছে বাহির থেকে যখন দরজা খুলে দেখি কেউ নেই । তখন বুঝি এটা তোমার প্রতি পিছুটান মাত্র। তখন আকাশের দিকে তাকিয়ে হাজার তারার ভীড়েও তোমাকে খুঁজে ফিরি ।
আর অশ্রু জড়াই ।
বাবা , একদিন গভীর রাতে যখন তোমার সাথে শুয়ে হাউমাউ করে কাঁদছিলাম তুমি উঠে যখন বলছিলে কি হয়েছে তোমার ?
আমি চোখের জল লুকিয়ে বলেছিলাম স্বপ্ন দেখেছি ।
সেদিন আমি স্বপ্ন দেখিনি বাবা । সেদিন তোমার মলিন চেহারাটা দেখে কাঁছিলাম বাবা । সেদিন তোমার ৪ বছরের পুরনো চশমাটা দেখে কাঁদেছিলাম বাবা ।
বাবা , কত রাত না খেয়ে থাকি কেউ একটা বারের জন্য জানতে চায় না খেয়েছি কি না । তখন তোমরা প্রতি ভীষণ রাগ হয় । কেনো তুমি জানতে চাওনা খেয়েছি কি না ।
আমি না খেলে যে তুমি বকা দিয়ে খাওয়াতে আজ কেন বকা দিয়ে খেতে বলো না বাবা ?
বাবা তুমি চলে যাবার পর থেকে একটা রাতও আমি খাইনি । দিনের কর্ম ব্যস্ততা শেষ করেই
বাসায় এসে তোমার ছবিটা দেখি বাবা । তোমাকে বড্ড ভালবাসি আর বাসতাম । কখনো বুঝতে দেইনি বাবা ।
বাবা আজ অসুখ হলেও ডাক্তার দেখাই না তোমার উপর অভিমান করে ।
তুমি কেনো বলো না ডাক্তার দেখাতে ? আগে না সামান্য কিছু হলেই পাগলের মতো ডাক্তারের কাছে ছুটোছুটি করতে বাবা ।
– আমাদের পিতারা নিম গাছের তিতা হলেও তাদের ছায়াটা ভীষণ ঠান্ডা হয় ।
– আমাদের বাবারা কখনো কাঁদে না । কারণ তাদের চোখের জল শরীরের ঘাম হয়ে বেড়িয়ে যায় ।
আমাদের বাবারা অভিনয় না করেও একজন ভাল অভিনেতা।
আজ মন খারাপের দিনগুলো-তে তোমাকে ভীষণ মনে পড়ে । যেদিন থেকে জীবনটাকে বুঝতে শিখেছি মাথার উপর তোমাকে পেয়েছি ।
শত কষ্ট সহ্য করে আমাদের কতশত আবদার পূরন করেছো ।
বিপদের সময় সান্তনা দিয়ে পাশে থেকেছো । চলার পথে কতো উপদেশ দিয়েছো । বট গাছের ছায়ার মতোই মাথা উপরে তুমি আমাদের ছায়া দিয়ে গেছো।
বাবা আজ মাথার উপরে আর বটগাছটা নেই । এতো রৌদ্র সহ্য করতে পারিনা বাবা ।
বাবা তুমিহীনা কষ্টের প্রহরগুলো বুকের ভিতরে জমাট হয়ে প্রতিনিয়ত কান্নার ঢেউ তুলে যায় । তুমি বাড়িতে থাকাতে মাস শেষে টাকা পাঠালেও কোন চিন্তা করতাম না ।
তুমি নিজে অসুস্থ থেকেও যখন সকালে উঠেই কল দিয়ে আমার খোঁজ নিতে আমি ঠিক আছি কি না ।
খেয়েছি কি না ? এতো কেয়ারিং এর মধ্যে কি কোন চিন্তা থাকতে পারে বলো বাবা ?
বাবা, মা, হারানোর যে কি কষ্ট যার বাবা, মা, নেই সেই একমাত্র এই কষ্ট অনুধাবন করতে পারবে । তুমি থাকতে কখনো দায়িত্ব কি জিনিশ বুঝতে পারিনি ।
আজ বুঝি দায়িত্ব জিনিশটা আসলেই কি ?
– আচ্ছা , বাবা কি করে পারতে এতো দায়িত্ব আর চিন্তা মাথায় নিয়ে চলতে ?
– কি করে পারতে বাবা ভাল না থেকেও ভাল থাকার অভিনয় করে যেতে ?
– কি করে পারতে এক জোড়া জুতা তালি দিয়ে বছরের পর বছর পরতে ?
– তোমার কি একজোড়া নতুন জুতা কিনতে ইচ্ছে করেনি বাবা ?
– কি করে পারলে বাটন উঠে যাওয়া একটা মোবাইল দিয়ে ৯টা বছর কাঁটাতে ?
– আচ্ছা , বাবা তুমি সবসময় কেনো কমদামি হোটেল গুলোতে খেতে যেতে?
– কখনো কি বড় হোটেলে খেতে ইচ্ছে করেনি বাবা ?
– আমাদের তো পূজোতে কাপর-চোপর দিতে ।
-তোমার শার্টে কখনো কখনো সেলাই দেখতাম ।
– কি করে পারতে বাবা একটা শার্ট দিয়ে বছরের পর বছর কাঁটাতে?
– তোমার কি কখনো একটা নতুন শার্ট কিনতে ইচ্ছে করেনি বাবা ?
– কি সুখ পেতে তুমি নিজের জীবনটা-কে এইভাবে বলি দিয়ে ?
– তুমি আমাদের আনন্দটুকু দিতে পারলেই , আমাদের সব চাওয়া পাওয়া পূরন করতে পারলেই কি তোমার সব পাওয়া হয়ে যেতো তাই না বাবা ?
বাবা পৃথিবীর সব বাবাই কি তোমার মতো ?
পরিবার , পরিজনদের মুখে হাঁসি ফুঁটাতে গিয়ে নিজের সুখ, নিজের ভাল থাকার কথা ভুলে গিয়ে জীবনটাকে বিলিয়ে দেয় ।
আমাদের বাবারা পরিবারের সুখের কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে তাদের জীবন থেকে সুখ নামক জিনিশটা হারিয়ে যায় তারা নিজেও জানে না ।
‘‘পৃথিবীতে অসংখ্য খারাপ মানুষ আছে , কিন্তু একটাও খারাপ বাবা নেই ’’
বাবা আজ কষ্টে বুকটা ফেটে যায়। যেটা হয়তো খুলে দেখাতে পারবো না । আজ আর কান্না আসে না চোখের জল তো সেই কবেই শুকিয়ে গেছে ।
আজ আর ভরসার হাতটা কেউ মাথায় রাখে না ।
মানুষের প্রতি যতই ভালবাসা জন্মে না কেনো , তোমার জন্য মনে যে ভালবাসা জন্মে, সেই ভালবাসার ভাগ আর কেউকে দিতে পারিনা ।
মনটাকে আর মানতে পারি না প্রশ্নগুলো থেকেই যায় ।
কেনো তুমি চলে গেছো ?
তুমি কি আর কখনো আসবে না বাবা ?
এতো ছোট ছেলেদেরকে কেন এতো সব দায়িত্ব মাথায় তুলে দিয়ে গেছো ?
আর সহ্য করতে পারছি না ।
– বাবা আমি যদি তোমার মতো অন্ধকারের পথযাত্রী হই । তবে কি তোমার সাথে ওপাড়ে দেখা হবে?
– তুমি কি আগের মতো আবার শাষন করবে?
– তোমার চোখের আড়াল হলে কি পাগলের মতো খুঁজবে বাবা ?
তাহলে আমি তোমার কাছেই আসবো । কতদিন হয়ে গেলো তোমার একটাও খবর পাই না । আমি আজও অপেক্ষায় থাকি কখন তুমি কল দিবে ।
কখন মোবাইলের ওপাশ থেকে তোমার কন্ঠটা শুনতে পাবো ।
বাবা , তোমার অসুস্থতায় অনেক ভেঙ্গে পড়েছিলাম । তোমার চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারবো কি না সেটা নিয়ে ?
পাঁচটা মাস রাতে ঠিকমতো ঘুমোতে পারিনি । আমরা আমাদের জীবনের শেষটুকু দিয়ে তোমার জন্য করেছি বাবা ।
তবুও যেন কিছু কষ্ট রয়ে গেছে । তুমি নাকি মায়ের কাছে বলে গিয়েছো আমার জন্য আমার এই অবুঝ শিশুগুলো যা করেছে আমি মরতেও আমার কোন কষ্ট থাকবে না ।
তোমার তো কোন কষ্ট নেই । নিজে ভাল থাকার জন্য , নিজের কথাটা চিন্তা করে ওপাড়ে চলে গেলে ।
আমাদের বুকের ভিতরের চিন চিন ব্যাথা কে দেখবে ?
আরো কয়েকটা দিন অপেক্ষা করতে পারলে বাবা ?
বাবা জানো তুমি যখন অসুস্থ ছিলে তোমাকে আর মাকে সান্তনা দিতাম ।
মা কান্না করলে ধমক দিয়ে বলতাম আমরা তো আছি এতো চিন্তা করো কেনো । একটু পরে নিজেই
সহ্য করতে পারতাম না । ওয়াশরুমে গিয়ে নিজেকে আবিষ্কার করতাম ।
বাবা তুমি যখন খাইতে চাইতে না । তোমাকে একটু ধকম দিতাম বাবা ।
জানিনা তুমি কি ভাবতে বাবা বিশ্বাস করো কখনো মন থেকে ধমক দেইনি । ডাক্তার যে বলে দিয়েছিলো এই সময়টাতে তাদের রুচি থাকে না ।
জোর করে হলেও কিছু খাওয়াতে হবে ।
তাই হয়তো একটু ধমক দিতাম বাবা । এটাও বুঝতাম যে কেউ খেতে পারলে ,তাকে জোর করতে হয় না । নিজ থেকেই খায় ।
বাবা, তুমি আমার ধমকে কষ্ট পেতে কি না জানি না । তোমাকে একটা ধকম দিয়েই আমি কান্না করে দিতাম । হয়তো চোখের কোনের জলগুলো তুমি দেখতে না বাবা । বাবা তোমার অবুঝ শিশুটা কোন ভুল করে থাকলে ক্ষমা করে দিও।
বাবা তোমাকে আরো কিছুটা দিন সেবা করার সুযোগটা না দিয়েই চলে গেলে?
বাবা , অনেক কিছু বলার আর লিখার থাকলেও , বলতেও পারছি না । লিখতেও পারছি না ।
চোখগুলো কেমন যেন ঝাপসা হয়ে গেছে । মস্তিস্কও নিজের ইচ্ছের বিরুদ্বে কাজ করছে ।
যদি আমাকে কখনো প্রশ্ন করা হয় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম উপহার তোমার কাছে কি ?
তবে আমি বলবো বাবা, মা – মানুষের জীবনে পাওয়া পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম উপহারগুলোর একটা ।
যেটা আমি পেয়েছি জীবনে।
জানিনা এই চিঠি কখনো তোমার দৃষ্টিগোচর হবে কি না ।
আমি চিঠির প্রতিউত্তরের অপেক্ষায় রইলাম বাবা ।
ভাল থেকো বাবা।
ইতি ,
তোমার হতভাগ্য ছোট সন্তান ।
লেখা : রাহুল রায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *